কে সেই ভয়ঙ্কর সম্রাট যার আট স্ত্র্রীর করুন পরিণতি হয়েছিল

‘‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট। রক্তজমাট শিকল পুজোর পাষাণবেদী…..” কাজী নজরুলের মত এরকম হাজার লেখক যুগে যুগে অত্যচারী শাসকের বিরুদ্ধে রচনা করেছে বহু কবিতা, গান,উপন্যাস।কেউ লেখনির মাধ্যমে,আবার কেউ দলবদ্ধ হয়ে অত্যচারী শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছে।

তবুও যুগে যুগে অত্যচারী শাসকের দেখা মিলেছে।তেমনি একজন অত্যাচারী শাসক চর্তুথ আইভান ভেসিলিভিখ।তিনি ‘আইভান দ্য টেরিবল’ বা ভয়ঙ্কর আইভান! নামে পরিচিত। তিনি রাশিয়ান গ্র্যান্ড প্রিন্স তৃতীয় আইভান ভেসিলিভিখ এর নাতি।১৫৩০ সালের ২৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করে চর্তুথ আইভান ভেসিলিভিখ।

১৫৪৭ থেকে ১৫৮৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত রাশিয়ার জার তথা সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি। তার শাসনামলেই কাজান, আস্ত্রাখান ও সিবির খানাত জয়ে সক্ষম হয় রাশিয়া। ফলে সেটি প্রায় ৪০,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল এক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। মধ্যযুগীয় কেবল একটি প্রদেশ থেকে রাশিয়াকে বিশাল সাম্রাজ্যে রুপান্তরের কারিগর ছিলেন আইভান।

এত অর্জনের থাকলেও ব্যাক্তি জীবনে মোটই সুখী ছিলেননা তিনি।তিনি ভয়ঙ্কর রাগী ছিলেন। ‘রাগ’ নামক পশুটা মাঝে মাঝে এতটাই লাগামছাড়া হয়ে যেত যে, তখন সেটাকে সামাল দেয়াই হয়ে উঠতো কষ্টকর। এইরকম ভয়ঙ্কর সম্রাটের জীবনে একে একে আসল আটটি স্ত্রী।প্রথম স্ত্রীর স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও বাকিদের র্নিমম পরিনতি হয়েছিল।

১ম স্ত্রী: ১৫৪৭ সালে মাত্র ষোল বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন আইভান। অল্প কয়েকদিনের মাঝেই সম্রাট একাকীত্ব অনুভব করতে শুরু করলেন। রাজ্য আছে, চাকর-বাকর আছে, আছে বিশাল এক সেনাবাহিনী; তবু মনের কথা একান্তে বলবার জন্য মনের মানুষই যে নেই! এজন্য সিংহাসন প্রাপ্তির দু’সপ্তাহের মাঝেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন রাজা।

রাজার বিয়ে বলে কথা। সারা রাশিয়া থেকে প্রায় ১,৫০০ অভিজাত পরিবারের বাবারা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন তাদের মেয়েদের, উদ্দেশ্য আদরের মেয়েটিকে সম্রাজ্ঞী বানাবেন। ক্রেমলিনে জড়ো হওয়া এতসব পাত্রীর মাঝে সেদিন আনাস্তাশিয়া রোমানোভ্‌না নামের এক তরুণীও ছিলো। শত শত তরুণীকে বাদ দিয়ে আইভানের ভালো লেগে যায় তাকেই। ব্যাস, এবার তাহলে বিয়ে হয়ে যাক!

১৫৪৭ সালে শুরু হয় আইভান-রোমানোভ্‌নার সুখের সংসার। তাদের ভালোবাসার ফসল হিসেবে সংসারে এসেছিলো ছয়টি সন্তান। কিন্তু সুখের এ সংসার খুব বেশিদিন টিকে রইলো না। ১৫৬০ সালের দিকে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন সম্রাজ্ঞী। রাজ্যের সেরা চিকিৎসকদের চিকিৎসাতেও কোনো লাভই হচ্ছিলো না, দিন দিন স্বাস্থ্যের কেবল অবনতিই ঘটছিলো। অবশেষে সবাইকে কাঁদিয়ে সেই বছরই পরপারে পাড়ি জমান তিনি।

এ ঘটনার পর ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পড়েন সম্রাট আইভান। তিনি ভাবতে শুরু করেন তাকে হত্যা করতে গিয়েই হয়তো তার স্ত্রীকে বিষ মেশানো কিছু খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে। রাশিয়ান বয়ারদের উপর আগে থেকেই ক্ষোভ ছিলো আইভানের। এ দুর্ঘটনা যেন সেই আগুনে ঘি ঢেলে দিলো। এরপর বিনা বিচারে অগণিত মানুষকে নির্মম নির্যাতন সইতে হয়েছে, মারাও গিয়েছে অনেকে।

ঐতিহাসিকগণ বলে থাকেন, রোমানোভ্‌নার মাঝে এক বিশেষ কোমলতা ছিলো যা আইভানের উন্মত্ততাকে বশীভূত করতে পারতো সহজেই। তার মৃত্যুই যেন শেকলে বাঁধা হিংস্র হায়েনাকে আরো উন্মত্ত করে ছেড়ে দেয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা থেকে ধারণা করা হয় যে, সম্রাজ্ঞীকে খুন করতে সম্ভবত পারদই ব্যবহার করা হয়েছিলো বিষ হিসেবে। তবে সেটাও পুরোপুরি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ তৎকালে ওষুধ হিসেবেও এর প্রচলন ছিলো।

২য় স্ত্রী: রোমানোভ্‌নার মৃত্যুর এক বছর পরেই মারিয়া তেম্রিয়ুকোভ্‌না কে সম্রাজ্ঞী করে ঘরে তোলেন আইভান। কিন্তু নতুন সম্রাজ্ঞীকে মন থেকে কেউই মেনে নিতে পারছিলো না, সবাই তাকে ভয় পেতো। এমনকি অনেকে বলতো তাকে নাকি দেখতে ডাইনীদের মতো লাগে! অনেকেই ভাবতো নতুন সম্রাজ্ঞী হয়তো তাদের সম্রাটকে দিয়ে নিজের কার্যসিদ্ধি করিয়ে নিচ্ছেন।

আইভানের প্রথম সংসারে ছয় সন্তানের জন্ম হলেও এদের চারজনই শৈশবে মারা যায়, বেঁচে থাকে শুধু দুজন- আইভান ও ফিওদর। এ দুজনকে সহ্যই করতে পারতেন না মারিয়া। মারিয়ার গর্ভে আইভানের এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়, নাম ছিলো তার ভাসিলি। কিন্তু দুর্ভাগা ভাসিলি জন্মের মাসখানেক পরই মারা যায়।

এভাবে আট বছর মারিয়ার সাথে সংসার টিকে ছিলো আইভানের। অবশেষে ১৫৬৯ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যান আইভানের এ জীবনসঙ্গিনীও। গুজব আছে যে, দ্বিতীয় স্ত্রীকে নাকি সম্রাট নিজেই বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিলেন। তবে রাজা কখনো এর সত্যতা নিশ্চিত করেন নি। বরঞ্চ মারিয়াকে খুনের অভিযোগ এনে আবারো অনেক লোককে নির্যাতন আর হত্যার মাধ্যমে মনের জ্বালা মেটান তিনি।

৩য় স্ত্রী: তৃতীয় এ বিয়ের সময় আবারো প্রথম বিয়ের মতো পাত্রীর সন্ধান করেন তিনি।অবশেষে সকল পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে রাশিয়ার নতুন সম্রাজ্ঞী হবার যোগ্যতা অর্জন করেন মার্ফা সোবাকিনা। ১৫৭১ সালের ২৬ জুন আইভানের সাথে সোবাকিনার বাগদান সম্পন্ন হয়। এতকিছু করেও শেষ রক্ষা হলো না।

বিয়ের অল্প কয়েকদিনের মাথায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন নতুন সম্রাজ্ঞী। অবশেষে বিয়ের সাজসজ্জা রাজপ্রাসাদ থেকে ঠিকমতো মুছে যাবার আগেই মাত্র দু’সপ্তাহের মাথায় মারা যান সোবাকিনা। তখন তার বয়স হয়েছিলো মাত্র ১৯ বছর। সোবাকিনার মৃত্যুর কারণ হিসেবেও বিষপ্রয়োগকেই মূল কারণ হিসেবে দেখেন অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা।

৪র্থ স্ত্রী: আগের তিন স্ত্রীর মৃত্যুর পেছনের কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছিলো বিষ প্রয়োগকে। তাই এবার রানী নির্বাচনের ব্যাপারে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করলেন আইভান। অনেক ভেবে-চিন্তে তিনি ঘরে তুললেন অ্যানা কল্‌তোভ্‌স্কায়া কে।

ওদিকে সম্রাটের সাথে এ বিয়ে নিয়ে ঝামেলা বেধে যায় রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের। কারণ চতুর্থ বিয়ে তারা কখনোই স্বীকৃতি দেয় না। তাদের দৃষ্টিতে এটি ধর্মবিরোধী এক কাজ।  তাই চার্চের আশীর্বাদ ছাড়াই বিয়ে করে এক ছাদের নিচে বসবাস শুরু করেন আইভান-অ্যানা দম্পতি।

বিয়ের দু’বছর পরও অ্যানার গর্ভে কোনো সন্তান না আসায় ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায় আইভানের। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন অ্যানাকে একটি আশ্রমে পাঠিয়ে দেবার। সেখানে মাটির নিচের এক অন্ধকার কুঠুরিতেই বন্দী করে রাখা হয় তাকে। আইভানের মৃত্যুর পরও জীবিত ছিলেন অ্যানা। আশ্রমের কর্তৃপক্ষ তখন তাকে মুক্তি দিতে চাইলেও তিনি আর সেই কুঠুরি ছেড়ে যেতে চান নি। অবশেষে ১৬২৬ সালে আশ্রমের সেই অন্ধকার ঘরেই মারা যান তিনি।

৫ম স্ত্রী. অর্থোডক্স চার্চের নিয়মানুযায়ী আর কোনো বিয়ে করারই অধিকার ছিলো না আইভানের। ওদিকে ১৫৭৩ সালের নভেম্বর মাসে মারিয়া দোল্গরুকায়ার প্রেমে পড়ে যান আইভান। তার শয়নে-স্বপনে-জাগরণে তখন কেবলই মারিয়ার ছবি ভাসতো। তাই প্রেমের ডাকে সাড়া দিতে গোপনে মারিয়ার সাথে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলেন তিনি।

গোলমাল বেধে যায় বাসর ঘরে। সেই রাতে স্ত্রীর সতীত্ব নিয়ে আইভানের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। ব্যাস, আর যায় কোথায়! সম্রাটের সন্দেহ বলে কথা। রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যান তিনি, আদেশ দেন সম্রাজ্ঞীকে ঘোড়ার লেজের সাথে বাঁধার জন্য। এরপর ঘোড়াগুলোকে আঘাত করলে সেগুলো ছুটতে শুরু করে। মারিয়ার শেষ পরিণতি যে কী হয়েছিলো তা বোধহয় না বললেও চলে।

৬ষ্ট স্ত্রী: একবার আইভান গিয়েছিলেন প্রিন্স পিটার ভাসিলচিকভের সাথে দেখা করতে। সেখানে গিয়েই তার নজর পড়ে পিটারের সপ্তদশী কন্যা অ্যানার দিকে। অ্যানার রুপ-লাবণ্যে আইভানের পাগল হবার দশা হয়। আবারো বিয়ের রঙ উঁকি দিয়ে যায় তার মনে। পরদিন তাই ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধ চলে যায় অ্যানার বাবার কাছে।

মেয়েকে আইভানের হাতে তুলে দিতে তার মন সায় দিচ্ছিলো না। ওদিকে সম্রাটের পক্ষ থেকে পাঠানো ঘটকদের “না” বলার সাহসটুকুও তার ছিলো না। তাই অ্যানা ভাসিল্‌চিকোভাহন আইভানের নতুন সম্রাজ্ঞী।কিন্তু দু’বছর পর অ্যানাকেও পাঠিয়ে দেয়া হয় এক আশ্রমে। সেখানে বন্দী অবস্থাতেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ধারণা করা হয়, এর পেছনে আইভানের নির্দেশ ছিলো।

৭ম স্ত্রী: ভাসিলিসা মেলেন্তিয়েভা ছিলেন আইভানেরই পরিচিত এক শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির স্ত্রী। লোকটির অসুস্থতার খবর শুনতে পেরে তিনি তাকে দেখতে আসেন। তখনই ভাসিলিসার দিকে নজর পড়ে যায় আইভানের, আবারো জেগে ওঠে তার প্রেমিক সত্ত্বা। স্বামীর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পরই তাই ভাসিলিসাকে দেখা যায় আইভানের প্রাসাদে চলে আসতে।

দুই বছর ধরে সুখেই সংসার করেন তারা। কিন্তু একটি বড় সত্যের কথা জানতেন না আইভান। ভাসিলিসা বিয়ের পর লুকিয়ে লুকিয়ে চুটিয়ে আরেকটি প্রেমও করছিলেন। একদিন শোবার ঘরে এসে স্ত্রীকে তার প্রেমিকার সাথে আবিষ্কার করেন আইভান!

যাহ্‌ বাবা! সব তো শেষ এখানেই। কীসের প্রেম, কীসের স্ত্রী! আবারো পাগলা কুকুরের মতোই ক্ষেপে উঠলেন সম্রাট আইভান। তার সাথে প্রতারণা! তার ভালোবাসা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা! এমনটা কিছুতেই বরদাশত করতে পারলেন না তিনি। সম্রাটের নির্দেশে দুজনকেই বন্দী করা হয়। এরপর একটি গর্ত করে দুজনকেই সেখানে পুঁতে ফেলা হয়। কথিত আছে, ভাসিলিসাকে জীবন্তই মাটি চাপা দেয়া হয়েছিলো।

৮ম স্ত্রী: মারিয়া ফিওদোরভনা নাগোয়া ছিলেন অাইভানের সর্বশেষ সহধর্মিনী  শুরুর দিকে সুন্দরী মারিয়াকে নিয়ে সুখেই দিন কাটছিলো বুড়ো আইভানের। কিন্তু সবসময় স্ত্রীকে মনমরা থাকতে দেখে একসময় তার মনও বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে নতুন স্ত্রীর প্রতি।

তাই এই স্ত্রীকে শেষ করে কীভাবে আরেকজন সম্রাজ্ঞী ঘরে আনা যায়, সেই ছকও কষতে শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আফসোস, নতুন স্ত্রী ঘরে আনার আগেই আইভানের পরপারের ডাক এসে গিয়েছিলো। ১৫৮৪ সালের ২৮ মার্চ দাবা খেলতে থাকা অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। শুধু তাই নয় তার নিষ্টুরতায় র্নিমমভাবে বলি হয়েছে তার নিজের পুত্র আইভান আইভানোভিচ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *