মানুষরূপী এক নরপিশাচের গল্প: এক ফোন-কলে ভণ্ডুল ১০১ খুন!

দুপুরের পর খুব একটা ঝামেলা থাকে না। চেয়ারে বসেই চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। একসময় ঘুমিয়েই পড়লেন। বার বার তার মাথাটি পেছন দিকে হেলে যাচ্ছে। তখনই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে তার। আবার ঘুমুচ্ছেন, আবার ভাঙছে। ঘুমিয়ে যাওয়া আর ঘুম ভাঙার মধ্যেই চলছে তার বিশ্রাম। পুরোপুরি ঘুম ভেঙে যায় ল্যান্ড-ফোনের কর্কশ রিং-টোনে। সোজা হয়ে বসে রিসিভার তুললেন।

‘হ্যালো! হ্যাঁ এটা ফরিদগঞ্জ থানা, ডিউটি অফিসার বলছি। কে বলছেন প্লিজ। ’ ওপাশ থেকে কিছু একটা শুনেই পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘শুনতে পাচ্ছি না। কোন খাল? বালিথুবায় বিআর খাল? আচ্ছা।

আপনি কে বলছেন? হ্যালো, হ্যালো!’ ওপাশে আর কোনো কথা নেই। ফোন রেখে দিলেন কর্মকর্তাটি। ওয়্যারলেস করলেন। টহল পুলিশকে খালপাড়ে লাশ পড়ে থাকার খবর জানিয়ে দিলেন। টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে খালপাড়ের কাছে প্রচুর মানুষ। তারা নাক চেপে আছে। কচুরিপানার আড়ালে ২০ থেকে ২২ বছরের এক নারীর লাশ পড়ে আছে। মুখে কাপড় গোঁজা। শরীরে সিগারেটের ছেঁকা। লাশ দেখে পুলিশ বুঝতে পারে, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। লাশের পরিচয় মেলেনি। কিছু দিন পর আবারও একই ধরনের ফোন-কল। এবার বিলের পাশে! পুলিশ লাশটি উদ্ধার করতে গিয়ে থমকে যায়। কদিন আগে বিলের পাশ থেকে উদ্ধার করা নারীর লাশের দেহে যে ধরনের নির্যাতনের চিহ্ন ছিল, এই মহিলার শরীরেও একই চিহ্ন!

এর কিছু দিন পর আবারও নারীর লাশের খবর! পুলিশকে এবার ভাবিয়ে তোলে। তদন্ত করতে পুলিশ মাঠে নামলেও কোনো কূলকিনারাই করতে পারছে না। এই তদন্তের মধ্যেই পরপর আরও তিন লাশ পড়ে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ নিজেই আতঙ্কিত। কারণ ছয়জনকেই ধর্ষণের পর একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত এটি কোনো সিরিয়াল কিলারের কাজ।

২০০৭ সালে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে এমন ছয় নারীর লাশ উদ্ধারের পর অজ্ঞাতনামা থেকে যাচ্ছিল। শ্রেণি-পেশায় মিল ছিল না কোনো লাশের। তবে একটি জায়গায় মিল ছিল, সব লাশই নারীর। ধর্ষণের পর কে বা কারা তাদের খুন করে ফেলে রাখছে। খালে, বিলে, নদীতে মিলছে লাশ। কিন্তু ঘটনার কূলকিনারা করতে না পারায় পুলিশ দিশাহারা।

একে একে নারীর লাশ পড়ছে। না পারছে পুলিশ খুনিকে আটকাতে, না পারছে হতভাগী এসব নারীর পরিচয় বের করতে। এতে ফরিদগঞ্জের ঘরে ঘরে আতঙ্ক। বিশেষ করে নারীরা ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। সন্ধ্যার পর কোনো নারীকেই তখন ঘরের বাইরে দেখা যেত না। সন্ধ্যার পর খাল-বিলের ধারেকাছে কেউ যেতেন না। পুলিশের টহলও বাড়ানো হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের মধ্যে সেখানে পাওয়া যায় আরও পাঁচ নারীর লাশ। ভৌতিক পরিস্থিতি সর্বত্র। সর্বশেষ যে নারীর লাশ পাওয়া যায়, শুধু তার পরিচয় মেলে। ওই নারীর নাম পারভীন। বাসা টঙ্গীতে।

২০০৯ সালে ফরিদগঞ্জ থানায় চাকরি করতেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই বছর ২১ জুলাই চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার কড়ইতলী গ্রামে একটি খালপাড় থেকে পারভীন নামে এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই নারীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। তার শরীর ও যৌনাঙ্গে ছিল সিগারেটের ছেঁকা। মুখের ভিতরে শাড়ির অংশ গোঁজা ছিল। ’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথম দিকে হত্যাকাণ্ডটি ছিল সূত্রবিহীন। পুলিশ কোনোভাবেই বুঝতে পারছিল না কারা, কী উদ্দেশ্যে ওই নারীকে খুন করেছে। কিন্তু পুলিশের সূত্র মিলে যায় একটি মোবাইল ফোন-কল থেকে। ওই ঘটনার পরদিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মোবাইলে ফোন আসে। এক ব্যক্তি নিজেকে রিকশাচালক পরিচয় দিয়ে জানান, যে নারীর লাশ পাওয়া গেছে তাকে আগের দিন বাসস্ট্যান্ড থেকে বহন করে এনেছিলেন।

গ্রামের দুই যুবকের নাম জানিয়ে বলেন, এরা ওই মহিলার সঙ্গে ছিল। পুলিশ ওই দুই যুবককে আটক করে। কিন্তু তাদের কাছে কোনো তথ্য পায় না পুলিশ। মাসখানেক পর তারা জামিনে মুক্ত। ’ হঠাৎ পুলিশের এই কর্মকর্তার মনে পড়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আসা সেই ফোন-কলটির কথা। কিন্তু ফোনটি ছিল বন্ধ। পুলিশ হতাশ। ফোনটি খোলা থাকলেই খোঁজ নেওয়ার জন্য একজন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক মাস পর ফোনটি খোলা পাওয়া যায়। পুলিশ জানতে পারে ফোনটি ব্যবহার হচ্ছে টঙ্গীতে।

ওই ফোন নম্বরে কল করে পুলিশ জানতে পারে, ফোনটি গাজীপুর বাজারের আখ এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেনা হয়েছে। পুলিশ আখ ব্যবসায়ী তাজুকে আটক করলে তিনি জানান, ২ আগস্ট রসু খাঁ ও মিজান নামের দুই ব্যক্তি তাদের মসজিদ থেকে ফ্যান চুরি করতে গেলে তিনি ও নৈশপ্রহরী মিলে দুজনকে হাতেনাতে আটক করেন। তখন তিনি রসু খাঁর কাছ থেকে সিমটি কেড়ে নিয়েছিলেন। পরে তিনি সেটি ১০০ টাকায় বিক্রি করে দেন। পুলিশ দিনক্ষণ হিসাব করে নিশ্চিত হয়, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রথম ফোনটি করেছিলেন রসু নিজে। তাজুর দেওয়া সূত্র অনুযায়ী টঙ্গীর মিরাশপাড়া থেকে ৭ অক্টোবর রাতে পুলিশ রসুকে গ্রেফতার করে। প্রথম দিকে রসু কোনো কিছু স্বীকার করেননি। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করলে রসু খাঁ পুলিশকে গালমন্দ করতে থাকেন। পুলিশ জেরা অব্যাহত রাখলে একপর্যায়ে তিনি পারভীন নামের নারীকে খুনের কথা স্বীকার করেন। পুলিশের তখন সন্দেহ হয়। পারভীন খুনের সঙ্গে তো আগের খুনগুলোর হুবহু মিল রয়েছে। তবে কি এই লোক জড়িত? পুলিশের এমন ভাবনায় সুফল পাওয়া যায়। জেরার মুখে রসু একে একে চাঁদপুরে ১১টি খুনের কথা স্বীকার করেন। এরপর আদালতে নেওয়া হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।

এর পরের গল্প মানুষরূপী এক অমানুষের : রসু পুলিশি জেরায় বলেছেন, বিয়ের আগে তিনি একটি মেয়েকে ভালোবাসতেন। কিন্তু তার ভাইয়েরা মেরে তার হাত ভেঙে দেন। এর পরই তিনি খুনের পরিকল্পনা করেন। একে একে খুন করতে থাকেন। তিনি পুলিশকে জানান, ‘আমি আমার অপমানের প্রতিশোধ নিতে খুন করি। ১০১ খুনের পর আর খুন করতাম না। আমি সন্ন্যাসী হতাম। মাজারে মাজারে ঘুরতাম। ’

পুলিশ তার কাছ থেকে জানতে পারে, নানা কৌশলে মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তাদের নিয়ে অভিসারে যাওয়ার কথা বলে একের পর এক হত্যা করতেন রসু খাঁ। শুধু খুনেই এই নরপিশাচের প্রতিহিংসার সমাপ্তি ঘটেনি, খুনের আগে ওই নারীদের ধর্ষণও করেন তিনি। রসু খাঁ প্রতিটি ঘটনাই ঘটিয়েছেন খাল, বিল বা নদীর ধারে। প্রথমে তিনি ধর্ষণ করতেন। এরপর সারা শরীরে সিগারেটের ছেঁকা দিতেন। মুখে কাপড় গুঁজে গলা টিপে ধরেন। এরপর পানিতে মাথা ঠেসে ধরে রাখেন। যতক্ষণ নারীটির দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে না যায় ততক্ষণ রসু পানির নিচেই মাথা ঠেসে ধরে রাখতেন। এসব বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছেন পুলিশের কাছে।

চাঁদপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমিরুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় নরপিশাচ রসু জবানবন্দি দেন। এতে ফরিদগঞ্জে সংঘটিত সব খুনের বর্ণনা দেন তিনি। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২০ জুলাই ফরিদগঞ্জের হাসা গ্রামের একটি খালপাড়ে রসু ও তার ভাগ্নে জহিরুল মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ শেষে খুন করেন পারভীন নামের এক নারীকে। এর আগে ২০০৭ সালে ফরিদগঞ্জের ভাটিয়ালপুরে শাহিদা নামে আরেক নারীকে ধর্ষণের পর খুন করেন রসু। একই বছর ফরিদগঞ্জের প্রত্যাশী এলাকায় বন্ধু মানিকের প্রেমিকা আঙ্গুর বেগম বন্ধুর সঙ্গে প্রতারণা করায় ফরিদগঞ্জে এনে তাকে খুন করেন রসু।

২০০৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি টঙ্গীতে ভাড়া থাকার সময় পাশের ভাড়াটিয়ার ছোট ভাই শাহিনের সঙ্গে এক মেয়ে প্রতারণা করায় তাকেও ফরিদগঞ্জের হাসা গ্রামে নিয়ে ধর্ষণের পর পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেন রসু। ২০০৭ সালে ওই গ্রামের হোসনে আরা নামে একজন এবং একই বছর বালিথুবায় বিআর খালে পলাশ নামে আরেক নারীকে নির্যাতনের পর হত্যা করেন রসু। ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বরে ফরিদগঞ্জের নানুপুর খালপাড়ে নিয়ে ধর্ষণ শেষে খুন করেন ফরিদপুুরের শাহিদাকে। ওই বছর ২৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ বালিয়া গ্রামে এনে খুন করেন কুমিল্লার কোহিনূরকে। ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ উপজেলার দুর্গাদি গ্রামে এনে খুন করা হয় রংপুরের মেয়ে মেহেদীকে। রসুর হাতে খুন হওয়া নারীদের লাশগুলো উদ্ধারের পর পুলিশ অজ্ঞাত বলে চিহ্নিত করলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে মামলা হয়। এর মধ্যে ফরিদগঞ্জ থানায় ৬টি, চাঁদপুর সদর থানায় ৪টি ও হাইমচর থানায় ১টি।

দুই বোনকে বিয়ে : পুলিশ জানায়, রসু বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি সব মেয়েকে একই কায়দায় যৌন নির্যাতন করতেন। তিনি স্ত্রীর আপন ছোট বোনকে বিয়ে করেন। তার প্রথম স্ত্রী মণির এক চোখ অন্ধ ছিল। এরপর তিনি স্ত্রীর ছোট বোন রীনা বেগমকে বিয়ে করেন। কিন্তু প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার আর ছাড়াছাড়ি হয়নি। তবে রীনা পুলিশকে জানান, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় রসু রাস্তা থেকে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যান। এ নিয়ে গ্রামে শালিসিও হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দুনিয়ার কুখ্যাত সব সিরিয়াল কিলারের হত্যার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। চাঁদপুরের সিরিয়াল কিলার রসু খাঁও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি খুন করেছেন নারীদের। সেই নারীরা সবাই হতদরিদ্র পরিবারের। এদের একজন ছাড়া সবাইকে তিনি খুনের আগে ধর্ষণ করেছেন। সবাইকে খুন করেছেন রাতের বেলায়। সবাইকে খালের কিনারে নিয়ে খুন করেছেন এবং সবার লাশও ফেলে রেখেছিলেন খালের পাশেই। কোনো খুনের ঘটনার সঙ্গে রসু খাঁ তাকে শনাক্ত করার মতো কোনো চিহ্ন রেখে যাননি।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, তবে চাঁদপুর থানা পুলিশের কাছে একটি মাত্র ফোন-কলই রসু খাঁর ১০১ নারীকে খুন করার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ধরা না পড়লে হয়তো তিনি এভাবেই একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটিয়েই যেতেন। রসুর বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামে। নরপিশাচ রসু জেলখানায় বন্দী। বীভৎস সেসব খুনের ঘটনায় তিনি এখন বিচারের মুখোমুখি। চাঁদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অরুণাভ চক্রবর্তী একটি হত্যা মামলায় এই সিরিয়াল কিলারের ফাঁসির রায় দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *