সূরা ‘আসর’ আমাদের যা শিক্ষা দেয়

আমরা অনেকেই পবিত্র কোরআনের সূরা আসর মুখস্থ করেছি এবং নিয়মিত পাঠ করি। কিন্তু আমরা সূরা ‘আসরের’ অর্থ জানি কি? মহান আল্লাহ তায়ালা এই সূরাটি কেন নাজিল করেছেন, তা আমরা জানি কি?

ছোট এই সূরাটির মধ্যে আল্লাহ তাআলা কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখেছেন। চমৎকার হেদায়েত রেখেছেন ক্ষুদে এ সূরাটির মধ্যে। ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির স্পষ্ট সনদ রেখেছেন তিনি মাত্র তিন আয়াত বিশিষ্ট এ সূরার মধ্যে। সাহাবায়ে কেরামের অনেকের সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তারা যখন একজন অপর জনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করতেন তখন সূরা আল আসর পাঠ করে শুনাতেন। (তাবরানি, হায়সামি ফি মাজমাআয যাওয়ায়েদ)

ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা যদি কুরআনে অন্য কোনো সূরা নাযিল না করে শুধু সূরা আল আসর নাযিল করতেন তাহলে এটা মানুষের হেদায়াতের জন্য যথেষ্ট হত।'(মিফতাহুস সাআদাহ : ইমাম শাফেয়ি)

যদি কেউ এ সূরায় গভীরভাবে দৃষ্টি দেয় তাহলে সে তাতে একটি উন্নত, সুন্দর, শান্তিময়, পরিপূর্ণ এবং সবার জন্য কল্যাণকর সমাজের চিত্র দেখতে পাবে। (আদওয়াউল বায়ান : ৯/৫০৭)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ সূরাটি শুরু করেছেন ‘ওয়াল আসর’ শব্দ দিয়ে। ইরশাদ হয়েছে-

وَالْعَصْرِ ﴿1﴾

১। ‘আসরের শপথ।’

‘আসর’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে?
‘আসর’ শব্দের দুটো অর্থ : এক. যুগ বা সময়। দুই. আসরের নামাজের সময়, যার আগমন হয় জোহরের নামাজের সময় শেষ হওয়ার পর এবং শেষ হয় সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে। আল্লাহ তাআলা কোনটির শপথ করেছেন? সময়ের শপথ না আসরের ওয়াক্তের শপথ?

সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হল তিনি ‘আসর’ বলতে এখানে সমস্ত সময়ের শপথ করেছেন। করেছেন যুগের শপথ। আর যুগের গর্ভেই এক জাতির উত্থান ঘটে, অন্য জাতির ঘটে পতন। রাত্রি আসে। যায় দিন। পরিবর্তিত হয় পরিবেশ ও মানব সমাজ। এমন সব পরিবর্তন আসে যা মানুষ কল্পনা করতে পারে না। কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত কখনো বা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পরিবর্তন আসে এ সময়ের ব্যবধানেই। তাই এ যুগ বা সময় বড় বিস্ময়কর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানব, দানব, জীব-জন্তুসহ তাবৎ সৃষ্টিকুলের জন্য। এটা বুঝানোর জন্যই আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করেছেন। (আত তিবইয়ান ফি আকসামিল বায়ান : ইবনুল কায়্যিম আল জাওযি)

কোনো বস্তু বা বিষয়ের শপথ করলে তার অস্বাভাবিক গুরুত্ব বুঝায়। সময় এমনই এক বিস্ময়ের আধার যে, আমরা জানি না অতীতকালে এটা কি কারণে হয়েছে। আমরা জানি না ভবিষ্যতে কি ঘটতে যাচ্ছে। এমনকি আমাদের নিজেদের জীবন, নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সম্পর্কে আমরা বলতে পারি না যে আগামী কালকের পরিবশেটা ঠিক আজকের মত থাকবে কি থাকবে না। দেখা যায় মানুষ নিজ সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামীকাল এটা সে বাস্তবায়ন করবে। অর্জন করবে এটা সেটা অনেক কিছু। সে দৃঢ় প্রত্যয়ী থাকে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে। সব উপকরণ থাকে হাতের নাগালে। সব মাধ্যম ও ফলাফল থাকে আপন নখদর্পনে। কোনো কিছুরই অভাব নেই। তবুও এ ‘সময়’ নামক বস্তুটির ব্যবধানে এমন কিছু ঘটে যায় যা তার সব কিছুকে তছনছ করে দেয়। সে ভাবতেই পারে না- কেন এমন হল। অনেক বড় বড় হিসাব সে মিলিয়েছে কিন্তু এর হিসাব সে মেলাতে পারছে না। এটাই হল ‘সময়’। আল্লাহ তাআলা এর প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই বলেছেন, ‘ওয়াল আসর’ – শপথ সময়ের।

এ থেকে আমরা জীবনের জন্য সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ হলেন মহান। তিনি মহান বস্তু ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর শপথ করেন না।

তাফসিরবিদ ইকরামাসহ অনেকে বলেছেন, ‘আসর’ বলতে এখানে আসরের নামাজের সময়ের শপথ করা হয়েছে। কেননা আসর নামাজের সময়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রখ্যাত তাফসিরবিদ ইবনে জারির আত তাবারী রহ. বলেছেন, ‘সঠিক কথা হল এখানে ‘আসর’ বলতে আল্লাহ তাআলা ‘সময়’ কে বুঝিয়েছেন। যুগের অপর নাম সময়। সকাল, বিকাল, দুপুর, রাত, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী, সহস্রাব্দ ইত্যাদি সব কিছুই বুঝায় এ ‘আসর’ বা ‘সময়’ নামক শব্দ। (জামেউল বায়ান : ১৫/২৮৯)

যদি এ সূরাটির প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দেয়া হয় তাহলে দেখা যাবে যে, সময়টাকে সকল যুগে টেনে নেয়া হয়েছে। মানুষকে সময়ের মধ্যে আবদ্ধ করা হয়েছে। সময় ছাড়া মানুষের জীবন যেমন সচল নয়, তেমনি সময় ব্যতীত তাদের কোনো অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতও নেই।

দ্বিতীয় আয়াত :
إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ ﴿2﴾
২। ‘অবশ্যই মানুষ ক্ষতিতে নিপতিত।’

যদিও এখানে ইনসান বা মানুষ শব্দটি এক বচনে ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু তার পূর্বে জাতিবাচক আলিফ লাম ব্যবহার করে পুরো মানব জাতিকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পুরো মানবগোষ্ঠি ক্ষতিগ্রস্ত। তারা সকলে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে যাদের মধ্যে চারটি গুণ আছে তারা ব্যতীত। এ চারটি গুণের অধিকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত নয়। তারা লাভবান সর্বদা। লাভবান ইহকাল ও পরকালে। পরবর্তী আয়াতে এ চারটি গুণের কথাই বর্ণিত হয়েছে।

তৃতীয় আয়াত :
إِلَّا الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ﴿3﴾

৩। ‘তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *