ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হালাল জীবিকা

হালাল জীবিকা মুমিন জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। শারীরিক ও আর্থিক সব ধরনের ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত হলো হালাল জীবিকা। হালালকে গ্রহণ ও হারামকে বর্জনের মধ্যেই রয়েছে মুমিনের দুনিয়া ও আখিরাত সফলতা। তাই হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্য গ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম।পবিত্র কোরআনে হালাল খাদ্য গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানব জাতি! তোমরা পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র খাবার খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করিও না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’। (সূরা বাকারাহ, আয়াত : ২)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নামাজ শেষ করে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে। ’ (সূরা জুমা : ১০)।এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত সাহল বিন আবদুল্লাহ বলেন, তিনটি জিনিসের মধ্যে নাজাত রয়েছে। ১. হালাল খাবার গ্রহণ করা, ২. ফরজসমূহ আদায় করা এবং ৩. নবী করিম (সা.)-এর পূর্ণ অনুসরণ করা। হজরত সাঈদ বিন ইয়াজিদ বলেন, ‘পাঁচটি গুণে ইলমের পূর্ণতা রয়েছে। আর তা হলো আল্লাহকে চেনা, হক বুঝা, আল্লাহর জন্য ইখলাছপূর্ণ আমল করা, সুন্নাহ মোতাবেক আমল ও হালাল খাদ্য গ্রহণ করা। এ পাঁচটির একটিও নষ্ট হলে কোনো আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। ’ (তাফসিরে কুরতুবি, ২/২০৮)।হালাল জীবিকা অর্জনে রসুল (সা.) উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কখনো খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন’। (বুখারি, হা/২০৭২)। হালাল রিজিক ভক্ষণ ছাড়া আল্লাহ ইবাদত কবুল করেন না। এ সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে দেহের গোশত হারাম মালে গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম মালে গঠিত দেহের জন্য জাহান্নামই সমীচীন’। (সহিহুল জামে : হা/৪৫১৯)। হুজুর (সা.) আরও বলেন, ‘হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। সিলসিলাতুস সহিহা : হা/২৬০৯)।আমরা যারা নানাভাবে হারামের সঙ্গে জড়িত, আমাদের অবশ্যই কোরআন এবং সহি হাদিসের এ কথাগুলো গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। হারাম থেকে বেরিয়ে হালালের পথ ধরতে হবে। তা না হলে রসুল (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুন ছাড়া আখিরাতের জীবনে আমাদের জন্য আর কিছুই থাকবে না। ইবনে মাজায় বর্ণিত এক হাদিসে রসুল (সা.) বলেন, আল্লাহর নির্ধারিত রিজিক পূর্ণমাত্রায় লাভ না করা পর্যন্ত কোনো জীব-জন্তুই মারা যাবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় কর এবং বৈধ পন্থায় আয়-উপার্জনের চেষ্টা কর। রিজিক প্রাপ্তিতে বিলম্ব যেন তোমাদের তা উপার্জনে অবৈধ পন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত না করে। কেন না আল্লাহর কাছে যা রয়েছে, তা কেবল তার আনুগত্যের মাধ্যমেই লাভ করা যায়। (ইবনে মাজাহ)।

আপনি কি নবী রাসূলের প্রিয় মাসের ফজিলত জানেন? না জানলে এক্ষুণি জেনে নিন।

বছরের ১২টি মাসের মধ্যে আরবি বা হিজরি সনের চারটি মাসকে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ভাবা হয়। শাবান এর অন্যতম। অন্য তিনটি মাস হলো রজব, রমজান ও মহররম। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান আমার উম্মতের মাস। শাবান মাস গুনাহ থেকে রক্ষা করে, রমজান মাস মানুষকে পবিত্র করে।শাবান মাসকে বলা হয় রমজানের আগমন ঘোষণাকারী মাস। শাবান মাসের বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হওয়ার কারণ এই মাসের ১৫ তারিখের রাত তাত্পর্যের দাবিদার। এই রাতে রিজিক ও সম্পদ বণ্টন করা হয়। হায়াত বাড়ানো কিংবা কমিয়ে দেওয়া হয়। মধ্য শাবানের রাতে বেশি বেশি করে নফল ইবাদত করা উচিত। নিজ গৃহে নফল ইবাদত করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহে নফল ইবাদত করেছেন। ইবনে মাজাহ ও বায়হাকি শরিফের হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘আল্লাহপাক এ রাতে প্রথম আসমানে চলে আসেন এবং মানুষকে ডেকে ডেকে বলতে থাকেন, তোমাদের মধ্যে এমন কোনো পাপী আছে কি? আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। তোমাদের মধ্যে কেউ আছে কি? আমার কাছে রিজিক চাইবে, আমি তাকে রিজিক দান করব। তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ আছে কি? আমার কাছে রোগ থেকে মুক্তি চাইবে, আমি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দিব। এভাবে আল্লাহতায়ালা সুবেহ সাদিক পর্যন্ত বান্দাকে ডাকতে থাকেন। তখন যে কেউ যে কোনো প্রার্থনা করবে তাই কবুল করা হবে।হজরত আব্দুল কাদের জিলানী তার গুনিয়াতুত তালেবানি কিতাবে বলেন, আয়েশা সিদ্দিকা (রা,) রসুল (সা.)কে বলতে শুনেছেন যে, শবেবরাতসহ চারটি রজনীতে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীর মানুষের জন্য তার রহমতের দরজাগুলো খুলে দেন। ১৪ শাবান সূর্যাস্ত থেকে ১৫ শাবান ফজর পর্যন্ত তার বান্দাদের জন্য রহমতের দরজা খোলা থাকে। এ রাতের ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। জিব্রাইল (আ.) একবার রসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রসুল (সা.)! আপনি উঠুন, নামাজ পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন। কারণ এটি ১৫ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের জন্য একশটি রহমতের দরজা খুলে দেন। আপনি আপনার উম্মতের জন্য দোয়া করুন।শাবানের এক তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখার বিশেষ ফজিলতের কথা হাদিস শরিফে রয়েছে। এ ছাড়াও ‘আইয়ামে বিজ’ তথা প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার ব্যাপারে হাদিস শরিফে উৎসাহিত করা হয়েছে।  হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘১৫ শাবানের রাত (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা তা ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং পরদিন রোজা রাখ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ হাদিস : ১৩৮৪)

হারাম সম্পদের পরিণতি ও তার প্রতিকার

রসূলুল্লাহ স. বলেছেন: ‘‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় হতে বিরত থাক। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, যে আল্লাহর রসূল! সাতটি বিষয় কী কী? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধ হতে পরায়ন করা এবং সতী-সাধবী মুমিন স্ত্রীগণের প্রতি অপবাদ আরোপ করা’’। 

রসূল স. বলেছেন: ‘‘কোন সমাজে সুদের প্রচলন হলে সেখানে মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, ব্যভিচারের প্রচলন হলে মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে এবং মাপে কম দেয়ার প্রথা চালু হলে আল্লাহ সেখানে বৃষ্টি বন্ধ করে দেবেন। এটা অবধারিত।’’ রসূল স. বলেছেন: ‘‘সুদের ৭০টি গুনাহ। তন্মধ্যে সর্বনি¤œ গুনাহটি হলো আপন মাকে বিয়ে করার গুনাহর সমান। আর সবচেয়ে জঘন্য সুদ হলো, সুদের পাওনা আদায় করতে গিয়ে কোন মুসলমানের সম্ভ্রম নষ্ট করা বা তার সম্পত্তি জবর দখল করা’’। রসূল স. বলেছেন: ‘‘কোন সুদখোর যদি এক দিরহাম পরিমাণও সুদ আদায় করে তবে তার গুনাহ ৩৬ বার ব্যভিচার করার সমান।’’
রসূল স. আরো বলেছেন: ‘‘আল্লাহ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের সাক্ষী, সুদের লেখক সকলেরই ওপরই অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।’’ ইসলামে সুদ ও সুদী কারবার নিষিদ্ধ। যদি কেউ এ গর্হিত কাজ করে তবে তার অপরাধের মাত্রানুযায়ী মুসলিম শাসক সুদের অর্থ ফেরত নেয়া, আর্থিক জরিমানা, আটকাদেশ, বেত্রাঘাত, নির্বাসন, মৃত্যুদÐ এমনকি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাও করতে পারেন। ইমাম আল-জাস্সাস র. বলেন: সুদের মাধ্যমে যেহেতু মানুষের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে কুক্ষিগত করা হয়, সেহেতু তার শাস্তি ছিনতাইকারীর শাস্তির মত হবে। সম্পদ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণ করা বা কাউকে ঘুষ দেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ‘‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের অর্থ আত্মসাৎ করো না, শাসকদের কাছে অর্থ নিয়ে যেও না, যাতে তোমরা মানুষের অর্থের একাংশ অন্যায় পন্থায় ভোগ করতে পার, অথচ তোমরা জান।’’ তোমরা শাসকদের উৎকোচ দিয়ে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার ব্যবস্থা করো না অথচ তোমরা তো জান যে, এ রকম করা বৈধ নয়।রসূল স. বলেছেন: আল্লাহ ঘুষদাতা ও ঘুষখোর উভয়কে অভিশম্পাত দিয়েছেন’’। রসূল স. আরো বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করলো, অতঃপর যার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, সে তাকে কোন হাদিয়া বা উপহার দিল, সে যদি এই হাদিয়া গ্রহণ করে, তবে তা হবে একটি বড় ধরনের সুদ খাওয়ার পর্যায়ভুক্ত’’। ইবনে মাসউদ রা, বলেন: ‘‘তোমরা ভাই-এর প্রয়োজন পূরণ করে দিয়ে তার কাছ থেকে যদি উপহার গ্রহণ করো তবে তা হবে হারাম।’’যে ব্যক্তি কোন কাজের জন্য বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত হয়, সে যদি তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত কোন কাজ করে দিয়ে যার জন্য কাজ করেছে তার কাছ থেকে কোন বিনিময় গ্রহণ করে, তবে সেটা সর্বসম্মতভাবে ঘুষ বিবেচিত হবে, তা উপহার, উপঢৌকন, হাদিয়া বা বকশিশ যে নামেই প্রদত্ত হোক না কেন। আর যদি দায়িত্বের অতিরিক্ত হয় এবং চাকুরীর সময়ের বাইরে করা হয় তবে সে জন্য পারিশ্রমিক নিলে তা ঘুষ হবে না।জুয়াকে ইসলাম অবৈধ উপার্জন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু ভাগ্যগণনা শয়তানের কাজ। সুতরাং এসব থেকে দূরে থাক। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। যে কোন ধরনের জুয়াই এ আয়াতের ঘোষণার মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা দাবা, তাস, পাশা, গুটি অথবা অন্য কোন জিনিসের দ্বারা খেলা হোক। এটা আসলে অবৈধ পন্থায় মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন করার আওতাভুক্ত। রসূল স. বলেছেন: ‘‘কেউ যদি এরূপ প্রস্তাব দেয় যে, এসো তোমার সাথে জুয়া খেলবো, তবে তার সদকা করা উচিত।’’ জুয়া সম্বন্ধে শুধু কথা বললেই যদি সাদকা বা কাফ্ফারা দিতে হয়, তবে কাজ করলে কী পরিণতি হতে পারে সে সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। তাস ও দাবা ইত্যাদি খেলা যদি আর্থিক হারজিত থেকে মুক্ত হয় এবং নিছক চিত্ত বিনোদনমূলক হয়, তবে তাও বৈধ হওয়ার বিষয় নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে হারাম, কারো মতে হালাল। কিন্তু আর্থিক হারজিত যুক্ত থাকলে তা যে হারাম, সে ব্যাপারে সকল মাযহাবের ইমামগণ একমত। পাশা জাতীয় জুয়া খেলা হারাম হওয়া সম্পর্কে ইমামগণ একমত হয়েছেন। কারণ রসুল স. বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি পাশা খেললো সে যেন নিজের হাতকে শূকরের গোশত ও রক্তের মধ্যে ডুবিয়ে রঙিন করলো।’’ দাবা খেলা তো অধিকাংশ আলিমের মতে হারাম, তাতে কোন কিছু বন্ধক রাখা তথা আর্থিক হারজিতের বাধ্যবাধকতা থাক বা না থাক। তবে বন্ধক রাখা এবং হেরে যাওয়া খেলোয়আড়ের বন্ধক রাখা ও আর্থিক হারজিত যুক্ত না থাকলেও অধিকাংশ আলিমের মতে দাবা খেলা হারাম। কেবল ইমাম শাফেঈ একে হালাল মনে করেন শুধু এ শর্তে যে, তা ঘরোয়াভাবে খেলা হবে এবং নামায কাযা অথবা অন্য কোন ফরয ওয়াজিব বিনষ্ট হওয়ার কারন হবে না। ইমাম নববী ইমাম শাফেঈর এই মতানুসারে ফতোয়া দিতেন। সেই সাথে তিনি পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের বিনিময়ে দাবা খেলাকে জুয়ার অন্তর্ভুক্ত বলে রায় দেন ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী ও ওয়াকী ইবনুল জাররাহ ব্যাখ্যা দেন যে, ‘আযলাম’ অর্থ দাবা খেলা। আলী রা. বলেন: ‘‘দাবা হলো অনারবদের জুয়া। আলী রা. একদিন দাবা খেলায় রত একদন লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: ‘‘তোমরা যা নিয়ে এরূপ ধ্যানে মগ্ন আছ তা কী? এগুলো স্পর্শ করার চেয়ে জ্বলন্ত আগুন স্পর্শ করাও ভালো। আল্লাহর কসম, তোমাদেরকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি। আলী রা. আলো বলেন: ‘‘দাবাড়–র ন্যায় মিথ্যাবাদী আর কেউ নেই। সে বলে আমি হত্যা করছি, অথচ সেহ হত্যা করেনি। সে বলে, ওটা মরেছে, অথচ কোন কিছুই মরেনি। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াহকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, দাবা খেলার ব্যাপারে আপনার কি আপত্তি আছে? তিনি বললেন: দাবা পুরোপুরি আপত্তিকর। মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কারযী দাদা খেলা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন: দাবা খেলার ন্যূনতম ক্ষতি এই যে, দাবাড়– কিয়ামাতের দিন বাতিলপন্থীদের সাথে একত্র হবে। রসূল স. বলেন: ‘‘আল্লাহ প্রতিদিন তাঁর সৃষ্টির প্রতি ৩৬০ (তিনশো ষাট) বার রহমাতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। যে দাবা খেলে, সে এর একটি দৃষ্টিও পায় না।

জেনে নিন মহানবী (সা.) যেভাবে তাসবিহ পাঠ করতেন

মহান আল্লাহ তায়ালার সুন্তুষ্টি লাভের আশায় অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা ফরয আমল শেষ করে বিভিন্ন নফল ইবাদত বন্দেগীর মধ্যে ডুবে থাকেন। বিভিন্ন ইবাদতের মধ্যে তাসবিহ পাঠ অন্যতম। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও তাসবিহ পাঠ করেছেন। আপনি কি জানেন নবীজী (সা.) কিভাবে তাসবিহ পাঠ করতেন? নিচে উল্লেখিত হাদিসটির মাধ্যমে তা জেনে নিন।

আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি আঙুল ভাঁজ করে তাসবিহ গুনতে। অপর বর্ণনায় অতিরিক্ত এসেছে, তাঁর ডান হাতে। (আবূ দাউদ ২/৮১, নং ১৫০২; তিরমিযী ৫/৫২১, নং ৩৪৮৬)।

জেনে নিন যেসব ব্যক্তির স্বপ্ন সত্য হয় বেশি!

আমরা যখন ঘুমায়, ঠিক তখন বিভিন্ন স্বপ্ন দেখি। কিন্তু কিছু ব্যক্তির স্বপ্ন অনেক সময় বাস্তবে দেখা যায়। এ সম্পর্কে একটি হাদিস উল্লেখ করা হলো-

وعن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: “إذا اقترب الزمان لم تكد رؤيا المؤمن تكذب، ورؤيا المؤمن جزء من ستة وأربعين جزءً من النبوة” متفق عليه،
وفي رواية: “أصدقكم رؤيا أصدقكم حديثاً”.
الحديث رواه البخاري في التعبير (باب القيد في المنام) ومسلم في أول كتاب الرؤيا.

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দিন যত যেতে থাকবে, কিয়ামত নিকটে হবে, মুমিনদের স্বপ্নগুলো তত মিথ্যা হতে দূরে থাকবে। ঈমানদারের স্বপ্ন হল নবুওয়তের ছিচল্লিশ ভাগের একভাগ। (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তোমাদের মধ্যে যে লোক যত বেশী সত্যবাদি হবে তার স্বপ্ন তত বেশী সত্যে পরিণত হবে।

এ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম:
১. মুমিনের জীবনে স্বপ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেয়ামত যত নিকটে আসবে ঈমানদারের স্বপ্ন তত বেশী সত্য হতে থাকবে।
২. ঈমানদারের জীবনে স্বপ্ন এত গুরুত্ব রাখে যে, তাকে নবুওয়তের ছিচল্লিশ ভাগের এক ভাগ বলা হয়েছে।
৩. মানুষ যত বেশী সততা ও সত্যবাদিতার চর্চা করবে সে ততবেশী সত্য স্বপ্ন দেখতে পাবে।
৪. যদি কেউ চায় সে সত্য স্বপ্ন দেখবে, সে যেন সৎ, সততা ও সত্যবাদিতার সাথে জীবন যাপন করে।

নবী করিমকে (সা.) প্রথম যে নারী দেখেন

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মুবারক শরীর স্পর্শ করেন প্রথম যে নারী তিনি হযরত ওয়ারাকা (রা.) একজন ইথুপিয়ান রমণী। নবীজি (সা.) জন্ম নেবার সময় উক্ত স্থানে ওয়ারাকা (রা.) ছিলেন এবং তার কোলেই প্রথম চোখ খোলেন নবীজি (সা.)।

তখন এই মহিমান্বিত জননীর বয়স ৯ অথবা ১০ বছর। তার সম্বন্ধে জানা যায়, তিনি খুবই কম কথা বলতেন এবং যোগাত্মক মানসিকতার ছিলেন। সব বিষয় বস্তুর মধ্যেই ভালো কিছু লক্ষ্য করতে চেষ্টা করতেন। হযরত আমিনা বিনতে ওয়াহাব (রা.) যখন অন্ত:সত্ত্বা ছিলেন, তিনি স্বপ্নে দেখেন যে তার পেট থেকে একটি সূর্য বেরিয়ে যাচ্ছে যা আলোকিত করছে সমস্ত মক্কা এবং মক্কা পেরিয়ে সমস্ত ইরাক। সে আলোয় সব কিছু আলোকিত হয়ে যাচ্ছে।তিনি প্রথম যাকে বলেন তিনি হলেন হযরত ওয়ারাকা (রা.)। হযরত ওয়ারাকা (রা.) হেসে বলেন- ‘স্বর্গ থেকে আসা বার্তা, আপনার সন্তান নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বান্দা’; সুতারং বলা যায় সে ছিলেন প্রথম বিশ্বাসীও বটে! তাদের মধ্যে আল্লাহ পাকের সম্বন্ধে ধারণা ছিল। তারা জানতেন আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা!নবী করিম (সা)-এর নব্যুয়াত প্রাপ্তির উপর যে নারী প্রথম বিশ্বাস স্থাপন করেন ইসলাম প্রতিষ্ঠার পূর্বে এবং কোরআনে করিম নাজিলের আগেই যিনি আল্লাহ সুবাহানা তালার উপর ঈমান আনেন এবং তিনি তার সম্প্রদায়ের কাছে শুদ্ধ নারী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। প্রত্যেকবার রাসূলে করিম (সা.) যখন কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হন, তিনি সাহায্য করেছেন উত্তর খুঁজতে।হেরা পর্বতে সাধনার জন্য আমাদের প্রিয় নবী রাসূলে করিম (সা.) যখন যান, হযরত খাদিজা (রা.) তার জন্য খাবার নিয়ে যেতেন এবং তখন তার বয়স ছিল ৫৫ বছর। একদিন শেষ নবী (সা.) বললেন- ‘ও খাদিজা আমাকে ঢেকে দাও’ এবং খাজিদা (রা.) তাকে সাহায্য করলেন এবং তার কথা শুনে আল্লাহর উপর ঈমান আনলেন বললেন- ‘আল্লাহ আপনাকে কখনোই অসম্মানিত করবেন না। আল্লাহ আপনাকে সে কারণে ভালোবাসেন; যে কারণে আমি আপনাকে ভালোবাসি।’

ক্ষমা লাভের শ্রেষ্ঠ উপায় দোয়া

ইসলাম ধর্মে দোয়া একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। দোয়া মানে প্রার্থনা। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে কিছু চাওয়া, ফরিয়াদ করা, ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহর কাছে মানুষ যত চাইবে আল্লাহ তত দেবেন। আল্লাহ চান বান্দা প্রতিটি বিষয়ে তার কাছে প্রার্থনা করুক। বান্দা যত চায় আল্লাহ তাতে তত খুশি হন। আর বান্দা প্রতিনিয়তই ভুল করে থাকে, তাই ভুলে থেকে ক্ষমা লাভের শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে দোয়া। এটি বান্দার জন্য স্রষ্টার একটি নেয়ামতও।

তবে দোয়া কবুলের জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত ও আদব আছে। নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে দোয়া করলে আশা করা যায় আল্লাহ তা কবুল করবেন। দোয়া কবুলের জন্য দিনরাতের মাঝে এমন অনেক সময় ও মুহূর্ত রেখেছেন, যে সময় দোয়া করলে তা কবুল হয় বলে হাদিসে বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে। দোয়া কবুলের কয়েকটি মুহূর্তের কথা এখানে আলোচনা করা হলো:

১. রাতের শেষ তৃতীয়াংশের যদি দোয়া করা হয়, তাহলে তা কবুল হয়- রাতের শেষ তৃতীয়াংশের দোয়া অবশ্যই কবুল করা হয়। হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ মহান সবচেয়ে কাছের আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকছো? আমি তোমার ডাকে সাড়া দেব। কে আমার কাছে চাইছো? আমি তাকে তা দেব। কে আছো আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী’ আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। (মুসলিম)

২. জুমার দিনের দোয়া অবশ্যই কবুল করা হয়- হাদিসে এসেছে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) আমাদের একদিন শুক্রবারে ফজিলত নিয়ে আলোচনা করছিলেন । আলোচনায় সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, যে সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায়রত অবস্থায় পায় এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ মহান অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসূল (সা.) তার হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টা সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন।’ (বুখারি)

৩. আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া কবুল হয়- হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া করা হলে তা ফিরিয়ে দেয়া হয় না।’ (তিরমিজি)

৪. সেজদারত অবস্থায় দোয়া করা হলে তা কবুল হয়- রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে সময়টাতে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটতম অবস্থায় থাকে তা হলো সেজদারত অবস্থা। সুতরাং তোমরা সে সময় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চাও বা প্রার্থনা করো।’ (মুসলিম)

৫. জমজমের পানি পান করার সময়ের দোয়া করা হলে তা কবুল হয়- রাসূল (সা.) বলেন, ‘জমজম পানি যে নিয়তে পান করা হবে, তা কবুল হবে।’ অর্থাৎ এই পানি পান করার সময় যে দোয়া করা হবে, ইনশাআল্লাহ তা অবশ্যই কবুল হবে। (ইবনে মাজাহ)

জবানের সুব্যবহারে নজর দিতে হবে

ইসলামে বাক সংযম বা জবানের হেফাজতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ চান বান্দাকে তিনি যে জবান দিয়েছেন তা যেন মিথ্যাচার ও অকথা-কুকথায় ব্যবহৃত না হয়। জবানের মাধ্যমে যেন অপরকে কষ্ট না দেওয়া হয়। বিশেষ করে আল্লাহর এই নেয়ামত যাতে মিথ্যাচারে ব্যবহৃত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। যারা ভালো কথা বলে তাদের পুরস্কৃত করা এবং যারা কটু কথা বলে তাদের তিরস্কৃত করার কথা বলা হয়েছে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে।

 

হজরত বেলাল ইবনে হারেস (রা.) বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোনো লোক ভালো কথা বলে, কিন্তু সে তার মর্যাদা সম্পর্কে বেখবর। তার জন্য আল্লাহতায়ালা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের দিন পর্যন্ত (অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত) নিজের সন্তুষ্টি লিখে রাখবেন। আবার কোনো লোক খারাপ কথা বলে, কিন্তু সে জানে না, তা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে? তার জন্য আল্লাহতায়ালা তার সঙ্গে সাক্ষাতের দিন (অর্থাৎ মৃত্যু) পর্যন্ত নিজের অসন্তুষ্টি লিখে রাখবেন। (শরহে সুন্নাহ)।  হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বর্জন করে তার জন্য জান্নাতের এক প্রান্তে প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে। আর যে ব্যক্তি হক ও ন্যায়ের ওপর অটল থেকে ঝগড়া-বিবাদ পরিত্যাগ করে তার জন্য জান্নাতের কেন্দ্রস্থলে প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে। আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে উত্তমরূপে গড়ে তোলে, তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অট্টালিকা তৈরি করা হবে। (তিরমিজি)। অপর হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, রসুুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা জান কি কোন বস্তু মানুষকে সর্বাপেক্ষা বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তা হলো আল্লাহর ভয় এবং সচ্চরিত্র। তোমরা জান কি মানুষকে কোন বস্তু সর্বাপেক্ষা বেশি দোজখে প্রবেশ করাবে? তা হলো দুটি ছিদ্র পথ। একটি মুখ এবং অন্যটি লজ্জাস্থান। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)। মিথ্যা কথা কখনো রসিকতার ছলেও বলা যাবে না।রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, সে ব্যক্তির জন্য ধ্বংস, যে কথা বলে এবং মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা কথা বলে। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস। (আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ ও দারেমী)। আরেক হাদিসে এসেছে,  রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোনো ব্যক্তি এরূপ কথা বলে, যা শুধু মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যেই। এ কথার জন্য সে দোজখের মধ্যে এত বেশি দূরে নিক্ষিপ্ত হবে, যতটা দূরত্ব রয়েছে আসমান এবং জমিনের মধ্যে। আসলেই মানুষের পদস্খলন অপেক্ষা মুখের স্খলন অধিক মারাত্মক। (বায়হাকী)। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জবানের হেফাজত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।